শূন্যতার পূর্ণতা
ছুটির দিনে সাধারণত একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠলেও, আজ বেশ তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেলো রাশেদের।
ঘুম ভাঙতেই পাশে নিরাকে না দেখে বেলকুনির দিকে গেলো রাশেদ।
নিরা সেখানেই দাড়িয়ে আছে। রাশেদকে দেখেই নিরা বললো,"একি আজতো শুক্রবার! তুমি এতো তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠলে যে ?বেশ তুমি তাহলে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি চা করে আনছি।" বলেই রান্নাঘরে চলে গেলো নিরা।
সারাদিন একদম চুপচাপ, সব সময় মন মরা গম্ভীর উদাসীন হয়ে থাকে। তবে নিরা ঠিক এমন টা ছিলো না। বেশ হাসিখুশি মেয়েটা হঠাৎ এমন হয়ে যাওয়ার কারণটা বেশ ভালো করেই জানা রাশেদর।
নিরার সাথে রাশেদের পরিচয় ঠিক নয় বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। সেখান থেকেই একে অপরের কাছে আসা। চার বছর প্রেমের পর দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে হয় রাশেদ নিরার। বিয়ের পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও ওদের কোন সন্তান নেই। ডাক্তার বলেছে নিরা কখনো মা হতে পারবে না। নিরা এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু এই বিষাক্ত সত্যিটা যে মানতেই হবে নিরাকে।সেই থেকেই নিরা একদম চুপচাপ। প্রতিটা সময় মন মরা হয়ে থাকে নিরা প্রচুর বই পড়তে ভালোবাসতো, আজকাল বইগুলোও ধরে না, নিরার প্রতিটি পছন্দের কাজ ও পছন্দের জিনিস গুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে নিরা, তবে কাউকে বুঝতে দেয় না সেটা।
নিজেকে মানিয়ে নেয়ার অভিনয়টা সবার সামনে করলেও ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে নিরা।এটা রাশেদ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে কিন্তু রাশেদেরও যে কিছুই করার নেই নিরা। কখনোই মা হতে পারবে না জেনে নিরা যতটা কষ্ট পেয়েছে রাশেদও তো ঠিক ততটাই কষ্ট পাচ্ছে। তবে রাশেদ সবসময় কিছুটা হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে নিরার জন্য। নিরাকে ভীষণ ভালোবাসে রাশেদ। আর ভালোবাসার মানুষটিকে চোখের সামনে এভাবে বিষণ্ণতায় ডুবে যেতে দেখে, মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় রাশেদের। নিরা আজকাল ঘন্টার পর ঘন্টা এক জায়গায় স্থীর হয়ে বসে কি যে ভাবে কে জানে, ওর বাবা মা ভাই বোন কারো সাথেও ফোনেও তেমন কথা বলে না আজকাল।
নিরাকে এভাবে থাকতে দেখে খুব কষ্ট হয় রাশেদের। সারাদিন অফিস করে রাতে বাসায় ফিরে রাশেদ। নিরা সারাদিন বাসায় একাই থাকে। রান্নাবান্না ঘরগোছানো সব কিছু নিরাই করে। রাশেদ নিরার জীবনে সব কিছু আগের মতো থাকলেও ওদের জীবন থেকে শুধু হাসি টাই যেন হারিয়ে গেছে। পাশের ফ্লেটের ফাহিম সাহেবের ছোট্টো মেয়ে আয়েশাকে নিরা খুব আদর করতো। দিনের খুব অল্প কিছু সময় আয়েশা নিরার কাছে থাকতো তবে যতটুকু সময় আয়েশা নিরার কাছে থাকতো নিরা চোখে মুখে হাসি লেগে থাকতো। মাঝে মাঝে আয়েশাকে নিরা নিজের হাতে খাইয়ে দিতো। আয়েশার মাও বাসায় এসে কিছু সময় গল্প করতো নিরার সাথে। নিরা দিনে কিছুটা সময়ের জন্য হলেও খুশি থাকতো।আয়েশাকে দেখে। কিন্তু গত মাসে ফাহিম সাহেব চাকরির কারণে পরিবার সহ অন্য শহরে চলে গেছে।
আয়েশা চলে যাওয়ার পর নিরা মানসিক ভাবে আরো ভেঙে পড়ে। নিরা একদম চুপচাপ হয়ে যায়। নিরার মনের অবস্থা রাশেদ বুঝতে পারছে। দিন দিন নিরা কেমন যেন অন্ধকারের হারিয়ে যাচ্ছে, রাশেদ সত্যিই নিরাকে এভাবে আর দেখতে পারছে না। রাশেদ যে নিরাকে ওর জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসে। বেলকুনিতে দাড়িয়ে এসব ভাবতে ভাবতে খুব কান্না পাচ্ছে রাশেদের।
চায়ের কাপ নিয়ে নিরা হাজির, কি হলো তুমি এখন এখানে দাড়িয়ে আছো যে?
এদিকে রাশেদ নিরার কথা ভাবতে ভাবতে চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছে।
কোন উত্তর না পেয়ে নিরা রাশেদের কাছে যেতেই দেখে রাশেদের চোখে জল।
নিরাঃ একি তুমি কাঁদছো কেন? কি হয়েছে তোমার?
রাশেদঃ কই কিছুনা তো!
নিরা এবার চায়ের কাপটা রেখে রাশেদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললোঃ কি হয়েছে বলো আমায়?
এবার আর রাশেদ নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না।
কান্না করতে বলতে লাগলো,"আমি তোমাকে এভাবে আর দেখতে পারছি না নিরা! আমি ভীষণ ভালোবাসি তোমায়। আমি আমার সেই নিরাকে ফিরে পেতে চাই। পৃথিবীতে আমি আর কিছু চাই না।"
নিরাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করছে রাশেদ। নিরা রাশেদ কে এর আগে কখনো কান্না করতে দেখে নি ।
নিরা এবার আর নিজের কান্না সামলাতে পারলো না। নিরাও কেঁদে যাচ্ছে।
কাউকে থামালো না কেউ। দুজনের বুকে জমানো কষ্ট গুলো যেনো অশ্রু হয়ে আজ অঝরে ঝরে যাচ্ছে।
ডাক্তার বলেছে কয়েকটার দিন নিরাকে নিয়ে বাহিরে কোথাও ঘুরে আসতে। পরদিন অফিস থেকে বেশ লম্বা ছুটি নিলো রাশেদ। বাসায় ফিরে নিরাকে বললো কাল আমরা গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার কথা শুনে নিরার মুখে খানিক হাসি ফুটলো।নিরা বললো, আমি তাহলে বাবা মা কে এখনি ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি । নিরার চোখে মুখে খুশিটুকু দেখে সারাদিনের সকল ক্লান্তি ভুলে গেলো রাশেদ। পরদিন ওরা গ্রামে গেলো এবার বেশ লম্বা সময় পর গ্রামে গেলো রাশেদ নিরা।
রাশেদের বাবা মা ছেলে এবং ছেলের বউকে দেখে ভীষণ খুশি। রাশেদ মনে মনে ভাবলো এখানে কয়েকটা দিন থাকলে নিরার মনটা হয়তো কিছুটা হলেও ভালো হবে।
পরদিন সকালে রাশেদ ঘুম থেকে উঠে বাড়ির উঠানের দিকে আসতেই দেখলো পাশের বাড়ির মিনু চাচিকে। তার কোলে ফুটফুটে একটি বাচ্চা মেয়ে নিয়ে রাশেদের মায়ের সাথে কথা বলছে...
রাশেদঃ চাচি কেমন আছেন?
মিনু বিবিঃ আছি বাজান, তোমার খবর? এত দিন পরে গেরামের কথা মনে পরলো?
রাশেদঃ হ্যাঁ চাচি। শহরে কাজের ব্যস্ততায় আর গ্রামে আসা হয়ে উঠে না। চাচি, আপনার কোলে বাচ্চাটা কে?
রাশেদের মা বললো,"এইডা তো ওনার নাতনী। মিনুর মাইয়া হালিমার কথা তো তুই শুনিস নাই; কি থেইকা যে কি হইলো মাইয়াডার, ক্যান যে এমন করলো আল্লাহই জানে!"
রাশেদঃ কেন মা? কি করেছে হালিমা ?
রাশেদের মা বললো,"আইজ সাত মাস হয় মাইয়াডা ফাঁস লইয়া মইরা গেছে। চোখের সামনেই তো বড় হইলো মাইয়াডা। বাপ মরা মাইয়াডারে মিনু কি কষ্ট কইরাই না বড় করছিলো, মাইয়াডারে বিয়া দিলো কিন্তু স্বামীর ঘর করতে পারলো না।এই রকম ফুলের লাহান একখান মাইয়া থাকতে হালিমারে তালাক দিয়া বাপের বাড়ি পাঠায়া দিলো জামাই; মাইয়াডা ছোড কাল থেইকা কষ্ট পাইতে পাইতে বড় হইছে। তালাকের কষ্টডা আর সইতে পারে নাই। দেড় বছরের এই বাচ্চাটারে অহন মিনুই পালে।বেচারি মিনুও জীবনে কম কষ্ট পাইলো না।"
রাশেদ হতবাক হয়ে গেলো কথা গুলো শুনে।
হালিমা রাশেদের বয়সে ছোট ছিলো।
রাশেদ মিনু বিবিকে জিজ্ঞেস করলো,"চাচি আপনার তো বয়স হয়েছে। ওরে নিয়া থাকতে আপনার সমস্যা হয় না?"
মিনু বিবি বললো,"বাজান, ওর এই দুনিয়াতে অহন আমি ছাড়া কেউ নাই। কে পালবো ওরে? আমি তো খালি চিন্তা করি, আমি মইরা গেলে ওর কি হইবো?"
রাশেদের খুব খারাপ লাগছে মিনু বিবির অবস্থা দেখে।
রাশেদ ওর নাম জিজ্ঞেস করলো।মিনু বিবি বললো ওর নাম তুলি।
তুলি আবার এদিকে কান্না শুরু করেছে। কান্নার আওয়াজ শুনে নিরা ঘর থেকে বাহিরে চলে এসেছে।
নিরা "কে গো এই বাচ্চাটা?" বলেই মিনু বিবির থেকে তুলিকে কোলে নিলো। নিরার কোলে আসতেই তুলি কান্না বন্ধ করলো। নিরাও খুব খুশি তুলিকে কোলে নিয়ে।
তুলির কান্না থামতে দেখে মিনু বিবিও খানিক স্বস্তি পেলো।
এর পর থেকে বেশ কয়েকদিন তুলি কে নিয়ে মিনু বিবি রাশেদের বাড়িতে আসতে লাগলো। নিরা রাশেদের মায়ের থেকে হালিমার কথা শুনেছে।
তুলি সারাদিন নিরার কাছে থাকে। রাশেদও তুলিকে কাছে পেয়ে ভীষণ খুশি। সেই সাথে নিরাও আগের মতো হতে শুরু করলো।
রাশেদের ছুটি শেষ হয়ে আসছে দুই একদিনের মধ্যেই। শহরে ফিরতে হবে ওদের।
রাশেদ রুমে বসে আছে। নিরা রাশেদের পাশে এসে বসে রাশেদের কাঁধে মাথা রেখে বললো," আচ্ছা তোমার কাছে আমি যদি কিছু চাই তুমি কি সেটা দিবে?
রাশেদ বললো, "বলো কি চাই তোমার,নিরা?"
নিরা বললো,"তুমি কি তুলিকে এনে দিতে পারবে? আমার তুলিকে চাই।এই অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই তুলি আমার কতটা আপন হয়েছে, তুমি জানো না। রাসেল,তুমি তুলিকে এনে দাও আমার কাছে।"
রাশেদও যে কয়েকদিন ধরে এটাই ভাবছে নিরা সেটা জানে না। নিরার মতো রাশেদেরও যে তুলির জন্য খারাপ লাগছে।
এই কয়েকদিন তুলিকে নিজের মেয়ের মতো রেখেছে নিরা।
রাশেদ নিরাকে বললো,"আমিও চাই তুলি আমাদের কাছে থাকুক। কিস্তু মিনু চাচি কি রাজি হবে?"
নিরা কাঁদছে। আর একটি কথা ও সে বললো না।
রাশেদ বললো,"তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি দেখছি কাল বাবা মায়ের সাথে কথা বলে।"
রাশেদ সারারাত ঘুমায় নি। মনে শুধু একটাই ভয়, মিনু চাচি কি রাজি হবে.?
সকাল হয়ে গেছে। রাশেদ আর নিরা বাবা মায়ের সাথে কথা বলার জন্য তাদের ঘরে গেলো। রাশেদের বাবা মা ঘরেই আছে। রাশেদ তাদের সব বললো। বললো তুলিকে ওরা ওদের সাথে রাখতে চায়।
রাশেদের মুখে সব শুনে ওর বাবা বললো,"দেখা বাবা বৌমার মনের অবস্থাটা আমরা বুঝি।
বাবা মা সন্তানদের সকল চাওয়া পাওয়া আগে থেকেই বুঝতে পারে। মিনু ছাড়া তুলির আর কেউ নেই। মিনু এই বয়সে এতটুকু একটা বাচ্চা এমনিতেও রাখতে পারবে না। আমরা কয়েক মাস আগে থেকেই এটা ভেবে রেখেছিলাম, কিন্তু তোমাদের বলতে পারিনি কারণ বৌমা আর তুমি কি ভাববে সেজন্য বলিনি।
তুলি যদি তোমাদের কাছে বড় হয় তাহলে তুলিও ওর বাবা মা পাবে আর তোমরাও ওকে নিজের সন্তাদের মতো মানুষ করতে পারবে ।"
বাবার কথা শুনে চোখে মুখে আনন্দ ফুটে উঠলো রাশেদ নিরার। সেদিনই রাশেদ,নিরা এবং রাশেদের বাবা-মা বিকেলে মিনু বিবির বাড়িতে গেলো৷ রাশেদের মা মিনু বিবিকে সব বুঝিয়ে বললো। নিরা এবং রাশেদ মিনু বিবির পাশে গিয়ে বসলো।
নিরা বললো," মা আমিও তো আপনার মেয়ের মতোই। আমি কথা দিচ্ছি তুলিকে আমি সারাজীবন আগলে রাখবো। আপনার তুলিকে আমি নিজের সন্তান হিসেবে নিজের কাছে রাখতে চাই।"
মিনু বিবি কাঁদতে কাঁদতে বললো,"মা আমি জানি তুমি তুলিরে নিজের সন্তানের মতোই বড় করবা, আমি এই কয়দিনেই দেখেছি তুমি তুলিরে নিজের মায়ের মতোই রাখছো। আমার তুলি তোমাগো কাছে ভালো থাকবো, আমি জানি মা। তুলি আইজ থেইকা তোমাগো কাছেই থাকবো, আইজ থেইকা তোমরাই তুলির বাপ মা।"
নিরা কাঁদতে কাঁদতে তু্লিকে কোলে নিলো। তবে এই কান্নাটা সুখের নিরাকে আজ পৃথিবীর সব চেয়ে সুখি মনে হচ্ছে। নিরা রাশেদকে ডেকে বললো, দেখো আজ থেকে তুলি আমাদের রাজকন্যা
আমাদের রাজকন্যা।
কোন মন্তব্য নেই